এই প্রবন্ধটি পড়ার পর আপনি UPSC মেইনস-এর ২০২১ সালের নিম্নলিখিত পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন (PYQ)-এর উত্তর লিখতে সক্ষম হবেন।
Describe the various causes and the effects of landslides. Mention components of the important components of National Landslide Risk Management strategy. 15 Marks (GS-3, Disaster Management/ Environment)
প্রেক্ষাপট
৭ জুলাই, কেরালার ওয়ায়ানাড়ের কাল্লাডি (Kalladi) টুইন-টানেল নির্মাণস্থলে ধ্বংসাবশেষ (Debris) ধসে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর পরিবেশগত বিধি মেনে চলা হয়েছে কি না এবং দুর্যোগের ভূ-আকৃতিগত (Geomorphological) কারণগুলি তদন্তের স্বার্থে কেরল সরকার প্রকল্পটি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
ভূমিকা
ওয়ায়ানাদে বারবার ভূমিধসের ঘটনা পশ্চিমঘাটের (Western Ghats) মারাত্মক পরিবেশগত ভঙ্গুরতা তুলে ধরে। ধারাবাহিক এই দুর্যোগগুলি দেখায় যে, এমন সংবেদনশীল পার্বত্য অঞ্চলে অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি জলবায়ু-সহনশীল (Climate-resilient) পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ওয়ায়ানাদের ভূমিকম্পীয় অঞ্চল (Seismic Zone)
- ভারতীয় মান নির্ধারণ ব্যুরো (BIS)-এর ভূমিকম্প অঞ্চল মানচিত্র অনুযায়ী, ওয়ায়ানাড় সিসমিক জোন–III-এর অন্তর্গত, যেখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে।
- যদিও এই অঞ্চলে ভূমিধসের প্রধান কারণ ভূমিকম্প নয়, তবে সামান্য ভূকম্পন, অতিবৃষ্টি এবং খাড়া ঢাল একত্রে ভূমিধসের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- তাই এই অঞ্চলের সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণনীতি অনুসরণ এবং কঠোর ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা (Land-use Planning) বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
ওয়ায়ানাদে ভূমিধসের কারণ কী?
- অত্যধিক বৃষ্টিপাত: টানা মৌসুমি ভারী বৃষ্টির ফলে মাটি সম্পূর্ণভাবে জলসিক্ত হয়ে ছিদ্রজল চাপ (Pore Pressure) বৃদ্ধি পায়, যা ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে ভূমিধসের সৃষ্টি করে।
- ভঙ্গুর ভূতাত্ত্বিক গঠন ও খাড়া ভূপ্রকৃতি: গভীরভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা এবং খাড়া ঢাল প্রাকৃতিকভাবেই প্রবল বৃষ্টির সময় সহজে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
- বন উজাড়: প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংসের ফলে মাটির দৃঢ়তা কমে গেছে, যার ফলে ঢালগুলি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।
- অপরিকল্পিত উন্নয়ন: টানেল নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া পাহাড় কাটা প্রাকৃতিক ভূ-স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
- জলবায়ু পরিবর্তন: স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ ধরনের ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
- অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা: দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির জল জমে মাটির ওজন বৃদ্ধি পায় এবং ঢালের স্থিতিশীলতা দ্রুত নষ্ট হয়।
দুর্যোগের প্রভাব
- প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি: এই দুর্যোগে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছে, কারণ বহু বাড়ি ধ্বংস হয়েছে বা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
- অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি: রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ লাইন এবং পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ জনপরিকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- কৃষি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি: কফি, চা ও মসলার বাগান কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ায় স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি এবং পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
- পরিবেশগত অবক্ষয়: ভূমিধসের ফলে মাটির ক্ষয়, নদীতে পলি জমা, বনভূমি ধ্বংস এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়েছে।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত: রাস্তা ভেঙে পড়ায় বহু গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে।
গাডগিল ও কস্তুরীরঙ্গন কমিটির সুপারিশ
- গাডগিল কমিটি (২০১১): সমগ্র পশ্চিমঘাটকে তিনটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল (Ecologically Sensitive Zones–ESZs)-এ ভাগ করার সুপারিশ করে। কমিটি খনন, পাথর খাদান (Quarrying) এবং বৃহৎ নির্মাণকাজে কঠোর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বিকেন্দ্রীভূত ও পরিবেশবান্ধব শাসনব্যবস্থার ওপর জোর দেয়।
- কস্তুরীরঙ্গন কমিটি (২০১৩): গাডগিল কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য গঠিত এই কমিটি তুলনামূলকভাবে উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। এটি পশ্চিমঘাটের মাত্র ৩৭% এলাকাকে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা (Ecologically Sensitive Areas–ESAs) হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করে। ESAs-এ খনন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি অ-সংবেদনশীল অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়।
করণীয়
- প্রারম্ভিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা (Early Warning System–EWS) শক্তিশালী করা: স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিমাপক যন্ত্র, ইনক্লিনোমিটার এবং অ্যাকোস্টিক সেন্সরের সাহায্যে স্থানীয় পর্যায়ে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
- বৈজ্ঞানিক ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা: ভূমিধস-প্রবণ এলাকায় ভারী অবকাঠামো নির্মাণ ও বসতি স্থাপনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
- পরিবেশগত পুনরুদ্ধার: বিদ্যমান বনভূমি সংরক্ষণ এবং বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং (Bio-engineering) প্রযুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালগুলিকে প্রাকৃতিক ও প্রকৌশলগতভাবে স্থিতিশীল করতে হবে।
- উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে পাথর খাদান, অবৈজ্ঞানিক পাহাড় কাটা এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment–EIA) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
- কমিটিগুলির সুপারিশ বাস্তবায়ন: গাডগিল ও কস্তুরীরঙ্গন কমিটির টেকসই উন্নয়ন-সংক্রান্ত মূল সুপারিশগুলি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
- নিকাশি অবকাঠামো উন্নত করা: পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ-সহনশীল নির্মাণ কৌশল অনুসরণ এবং কার্যকর নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তুলে জল জমা রোধ করতে হবে।
উপসংহার
ওয়ায়ানাড়ের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে উন্নয়ন কখনোই পরিবেশগত সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে হতে পারে না। মানবজীবন এবং পশ্চিমঘাটের মতো অমূল্য প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষার জন্য কেবল দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া জানানো নয়, বরং বৈজ্ঞানিক, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্যোগ প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের পথ।