প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (IISER), কলকাতার গবেষকরা ‘জার্নাল অফ হ্যাজার্ডাস মেটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’-এ একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন। সেখানে দেখা গেছে যে, সুন্দরবনের মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো একটি “নতুন কার্বন ভাণ্ডার” (novel carbon reservoir) হিসেবে কাজ করছে। এই গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে যে কীভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হয় এবং পানি বা জলে অর্গানিক কার্বন ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে পানিতে ব্যাকটেরিয়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, যা বিশ্বের বৃহত্তম নিরবচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ বনের প্রাকৃতিক কার্বন ভারসাম্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. ব্লু কার্বন সিঙ্ক হিসেবে সুন্দরবন
- ব্লু কার্বন (Blue Carbon): সমুদ্র এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র যেমন— ম্যানগ্রোভ, সামুদ্রিক ঘাস এবং লবণাক্ত জলাভূমি যে কার্বন শোষণ করে, তাকেই ‘ব্লু কার্বন’ বলা হয়।
- সুন্দরবনের ভূমিকা: গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় অবস্থিত সুন্দরবন বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে তা গাছপালা এবং মাটিতে জমা রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি বাস্তুতন্ত্র।
- পরিবেশগত ঝুঁকি: উজানের শহরগুলো থেকে আসা বর্জ্যের কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক (প্রতি লিটারে ৫ থেকে ৫৮টি কণা) জমা হচ্ছে, বিশেষ করে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির স্রোতের সাথে এগুলো ভেসে আসে।
২. “নতুন কার্বন ভাণ্ডার” বা অভিনব ঘটনা
- কার্বন নিঃসরণ: মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রায় 90% কার্বন। এগুলো যখন ভেঙে যায়, তখন তারা সামুদ্রিক পরিবেশে দ্রবীভূত জৈব কার্বন (DOC) ছেড়ে দেয়।
- বায়োজেনিক কার্বন: প্লাস্টিকের কণার উপরে বসবাসকারী অণুজীবরা (যাদের প্লাস্টিস্ফিয়ার বলা হয়) নিজস্ব কার্বন তৈরি করে, যা প্রাকৃতিক কার্বন চক্রকে আরও জটিল করে তোলে।
- খাদ্য শৃঙ্খলে প্রভাব: কার্বনের এই কৃত্রিম উৎসের কারণে ব্যাকটেরিয়া স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এটি প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল নষ্ট করতে পারে এবং কার্বন জমা রাখার ক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
৩. কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা
- প্লাস্টিস্ফিয়ার (Plastisphere): মানুষের তৈরি প্লাস্টিক পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে সেখানে বসবাসকারী অণুজীবদের বাস্তুতন্ত্রকে এই নামে ডাকা হয়।
- মাইক্রোপ্লাস্টিক: যেসব প্লাস্টিক কণার ব্যাস 5mm-এর কম।
- ন্যানোপ্লাস্টিক: অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা (সাধারণত 1 মাইক্রোমিটারের কম), যা সামুদ্রিক প্রাণীদের কোষের আবরণ ভেদ করতে পারে।
| সুন্দরবন ভৌগোলিক অবস্থান: বঙ্গোপসাগরের উপকূলে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা নদীর বদ্বীপ নিয়ে এটি গঠিত।বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন: এটি বিশ্বের বৃহত্তম নিরবচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ বন, যার প্রায় 40% ভারতে (পশ্চিমবঙ্গ) এবং বাকি অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত।উদ্ভিদ ও প্রাণী:সুন্দরী গাছ (Heritiera fomes): এই বনের প্রধান ম্যানগ্রোভ প্রজাতি, যার নামানুসারে বনের নাম হয়েছে সুন্দরবন।নিউমাটোফোর (Pneumatophores): এগুলো বিশেষ ধরনের “শ্বাসমূল” যা জলাবদ্ধ মাটিতে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য কাদা থেকে খাড়াভাবে উপরের দিকে বৃদ্ধি পায়।রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার: সুন্দরবন হলো বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে বাঘ বাস করে।অন্যান্য প্রজাতি: মোহনার কুমির, ভারতীয় অজগর, ইরাবতী ডলফিন এবং অলিভ রিডলে কচ্ছপ।আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:ইউনেস্কো (UNESCO) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট: ভারত অংশে 1987 সালে এবং বাংলাদেশ অংশে 1997 সালে এই স্বীকৃতি পায়।রামসার সাইট (Ramsar Site): ভারতীয় সুন্দরবন জলাভূমি 2019 সালের জানুয়ারি মাসে “আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি” হিসেবে স্বীকৃতি পায়।বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ: এটি ‘ম্যান অ্যান্ড বায়োস্ফিয়ার’ (MAB) কর্মসূচির আওতায় একটি সংরক্ষিত এলাকা। |
Q. সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্রের প্রসঙ্গে নিচের বিবৃতিগুলো বিবেচনা করুন:
বিবৃতি-I: সুন্দরবনের মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো দ্রবীভূত জৈব কার্বন নিঃসরণ করে একটি "নতুন কার্বন ভাণ্ডার" হিসেবে কাজ করছে, যা ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
বিবৃতি-II: সুন্দরবন হলো বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যা রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত এবং যেখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বাস করে।
উপরের বিবৃতিগুলোর প্রেক্ষিতে নিচের কোনটি সঠিক?
(a) বিবৃতি-I এবং বিবৃতি-II উভয়ই সঠিক এবং বিবৃতি-II হলো বিবৃতি-I এর সঠিক ব্যাখ্যা।
(b) বিবৃতি-I এবং বিবৃতি-II উভয়ই সঠিক কিন্তু বিবৃতি-II, বিবৃতি-I এর সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
(c) বিবৃতি-I সঠিক কিন্তু বিবৃতি-II ভুল।
(d) বিবৃতি-I ভুল কিন্তু বিবৃতি-II সঠিক।
সমাধান: (b)
বিবৃতি-I সঠিক: IISER কলকাতার গবেষণা নিশ্চিত করে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ভেঙে গিয়ে জৈব কার্বন নিঃসরণ করে এবং একটি কৃত্রিম কার্বন ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
বিবৃতি-II সঠিক: সুন্দরবন সত্যিই ম্যানগ্রোভের মধ্যে বাঘের বসবাসের জন্য অনন্য এবং এটি রামসার সাইটের মর্যাদাপ্রাপ্ত। তবে, বিবৃতি-II-তে দেওয়া ভৌগোলিক বা জৈবিক তথ্যটি বিবৃতি-I-তে বর্ণিত রাসায়নিক কার্বন প্রক্রিয়ার কারণ বা ব্যাখ্যা নয়।